স্বপ্নে আল্লাহর সঙ্গে কথা বলেন কবিরাজ ফাহিমা!

অনলাইন থেকে: সাতক্ষীরা সদর উপজেলার আগরদাঁড়ী ইউনিয়নের ইন্দিরা গ্রামের ফাহিমা খাতুন নামে এক কবিরাজের কারসাজিতে সর্বশান্ত হতে শুরু করেছেন সাধারণ মানুষ।

কথার মারপাচে গত ফাল্গুন মাস থেকে বিভিন্ন রোগের চিকিৎসার নামে মানুষকে প্রতারিত করে ঝাড়-ফুঁক, পানিপড়া ও তেলপড়া দিয়ে হাতিয়ে নিচ্ছেন হাজার হাজার টাকা। জ্বিনের মাধ্যমে ক্যানসার, স্টক, প্যারালাইসিস, পেটে ব্যথা, আলসার, নিঃসন্তান, জ্বিনে ধরাসহ বিভিন্ন রোগের চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে বলে তিনি মানুষকে প্রতারিত করছেন।

বিভিন্ন লোকের অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে কবিরাজ ফাহিমা খাতুনের বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, ঘরের বারান্দায় সিরিয়ালে বসে আছেন রোগী ও তাদের স্বজনরা। অপরিচ্ছন্ন ঘরের মেঝেতে রয়েছে নিম গাছের পাতা, পানি ও তেলের বোতল। নেই আধুনিক চিকিৎসার কোনো যন্ত্রপাতি, নেই কোনো ট্রেড লাইসেন্স, প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষারও কোনো সনদ নেই। এ ছাড়া ভেষজ চিকিৎসার কোনো বইপত্র ও নেই।

কবিরাজ ফাহিমা খাতুনের ভাষ্য অনুযায়ী, তার জ্বিন আছে এবং এ জ্বিনের মাধ্যমেই চিকিৎসা সেবা দেওয়া হয়। এভাবে দূর-দূরান্ত থেকে আসা অসহায় মানুষের কাছ থেকে হাতিয়ে নিচ্ছেন হাজার হাজার টাকা।

প্রতিবেশীরা জানান, মাত্র তৃতীয় শ্রেণি পর্যন্ত লেখাপড়া করেছেন ফাহিমা খাতুন। অল্প বয়সে বিয়ে হয় ইন্দিরা গ্রামের আবুল হাসানের সঙ্গে। বর্তমানে তার দুই সন্তান। ফাহিমার স্বামী আবুল হাসান কৃষি কাজ করে জীবীকা নির্বাহ করেন। তারা জামাতে ইসলামীর সক্রিয় কর্মী। বিভিন্ন জায়গায় বৈঠকে গিয়ে ফাহিমা খাতুন আরবি শিখেছেন। সেই আরবিকে কাজে লাগিয়ে বর্তমানে শুরু করেছেন কবিরাজির রমরমা ব্যবসা।

তারা আরও বলেন, বছর কয়েক আগে ফাহিমা খাতুনের একটি রোগ হয়। বিভিন্ন জায়গা থেকে ওষুধ খেয়ে সেই রোগ থেকে বর্তমানে একটু সেরে উঠেছে। গত ফাল্গুন মাস থেকে হঠাৎ তিনি প্রচার করতে শুরু করেন স্বপ্নের মাধ্যমে তার রোগ সেরে গেছে। স্বপ্নে তিনি জ্বিনের সঙ্গে কথা বলেছেন। জ্বিনের মাধ্যমে তিনি বিভিন্ন রোগের চিকিৎসা দিতে সক্ষম। এরপর থেকে বিভিন্ন এলাকার মানুষ তার কাছে আসতে শুরু করে। প্রতি মঙ্গলবার তার ওখানে এসে ১০ টাকা দিয়ে সিরিয়াল দিতে হয়।

আর শনিবার তিনি ঝাঁড়ফুঁক, তেল ও পানিপড়া দেন। এজন্য বিভিন্ন অংকের টাকা নেন রোগীদের কাছ থেকে। রোগী এলে তিনি রোগ অনুয়ায়ী তার সঙ্গে চুক্তি করেন। রোগ সারার আগে কিছু অগ্রিম ও রোগ সারলে বাকি টাকা দেওয়ার শর্ত থাকে। তবে রোগ না সারলে অগ্রিম টাকা ফেরত দেন না। ফলে রোগ না সারলেও তিনি রোগ সারানোর কথা বলে হাতিয়ে নেন হাজার হাজার টাকা।

কবিরাজি চিকিৎসা নিতে আসা একাধিক ব্যক্তির কাছে জানতে চাইলে তারা জানান, বিভিন্ন মারফতে জানতে পেরে তারা এখানে এসেছেন চিকিৎসা নিতে। বেশ কয়েক সপ্তাহ ধরে এখানে আছেন কেউ কেউ। তবে রোগ সেরে যাওয়ার কোনো লক্ষণ এখনও দেখতে পাননি।

এ ব্যাপারে জানতে চাইলে ফাহিমা খাতুনের স্বামী আবুল হাসান বলেন, ‘আমার স্ত্রীর বড় একটি রোগ ছিল। স্বপ্নের মাধ্যমে সেই রোগ সেরে গেছে। জ্বিনের মাধ্যমে আমার স্ত্রী চিকিৎসাসেবা দেন। অনেকেই এখান থেকে চিকিৎসা নিয়ে সেরে উঠেছে।’

কবিরাজ ফাহিমা খাতুন বলেন, ‘ক্যানসার, প্যারালাইজড, স্টকের রোগী, পেটব্যাথা, জ্বালা যন্ত্রণা, আলসার, হাড় খাওয়া, হাড় বাড়া, পঙ্গু রোগীদের ঝাড়ানোর মাধ্যমে আমি চিকিৎসা করি। আমার এখান থেকে চিকিৎসা নিয়ে অনেকেই সুস্থ হয়েছেন। এ ছাড়া যাদের সন্তান হয় না তাদের আমি চিকিৎসা দিই। কী কারণে সন্তান হয় না তা আমি দেখে বলতে পারি।’

কীভাবে দেখেন এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘আমি আমলের মাধ্যমে দেখি। আল্লাহ শক্তি দেয় বলে আমি দেখতে পারি। আপনারা কি দেখতে পারবেন? আমি গাটুলি কাটি। যেটি আপনারা পারেন না। এ ছাড়া জ্বিন-ভূত লাগলে ঝাড়ানোর মাধ্যমে আমি সেটিও চিকিৎসা করি।’

চিকিৎসা করতে আপনি কি টাকা নেন- এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘অনেকেই তাদের রোগের চিকিৎসা নিতে এসে আমাকে টাকা দেয়। এ ছাড়া বড় ধরনের রোগ হলে আমি টাকা চেয়ে নিতে পারি। স্বপ্নের মাধ্যমে আল্লাহর সঙ্গে আমার কথা হয়। আল্লাহ আমাকে বলেছে যে- তুমি টাকা চেয়ে নিতে পারবা। এজন্য বড় বড় রোগ নিয়ে এলে আমি টাকা চেয়ে নিই বা বলি তোমার রোগ সেরে গেলে আমাকে এতা টাকা দিতে হবে।’

বড় বড় রোগ নিয়ে এলে আপনি কত টাকা চেয়ে নিতে পারবেন- এমন প্রশ্নের জবাবে ফাহিমা খাতুন বলেন, ‘যে যেমন রোগ নিয়ে আসবে তার কাছে আমি তেমন টাকা দাবি করতে পারি।’আপনার লাইসেন্স আছে কি? এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, ‘না। আমার কোনো লাইসেন্স নেই।’এ ব্যাপারে সাতক্ষীরার সিভিল সার্জন হুসাইন শাফায়াত বলেন, ‘পানি পড়া, তেল পড়া, ঝাড়ফুঁক দিয়ে স্টক, প্যারালাইসিস, পেটে ব্যথা, আলসার, নিঃসন্তান, হাড় ক্ষয় রোগের চিকিৎসা সম্ভব না। যদি কেউ এগুলো করে তাহলে আমাদের চিকিৎসা বিজ্ঞানের ভাষায় বলব তিনি নিশ্চিত প্রতারণা করছেন। তার বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা উচিৎ।’সাতক্ষীরা সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ফাতেমা-তুজ-জোহরা বলেন, ‘বিষয়টি আমার জানা নেই। এখনই খোঁজখবর নিয়ে ব্যবস্থা গ্রহণ করছি।’

পরিচিতি Ibrahim Bhuiyan

এটাও চেক করতে পারেন

ভূঞাপুরে তিনতলা ছাদ থেকে পড়ে নির্মাণ শ্রমিকের মৃত্যু

নিজস্ব প্রতিবেদক: টাঙ্গাইলের ভূঞাপুরের কয়ড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের তিনতলা ছাদ থেকে পড়ে সুমন মন্ডল (২৫) …

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *